বিচারের প্রহসন নাকি আইনের প্রকাশ্য অবমাননা..? চট্টগ্রামে রিভিশন গ্রহণে ন্যায়বোধের নির্মম পরাজয়
- আপডেট সময় : ০৩:১০:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
- / ৯৪ বার দেখা হয়েছে
বিশেষ প্রতিবেদন:
নটরাজ এন. এ পলাশ।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি মামলার সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না- বরং তা রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ, আইনের শাসন এবং বিচারিক নৈতিকতার ভিতকেই কাঁপিয়ে দেয়। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এক ভূমি বিরোধ মামলাকে ঘিরে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে তেমনই এক গভীর উদ্বেগজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায়।
মামলার সূত্রপাত ছিল সম্পূর্ণ বৈধ ও সুসংহত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। জালাল আহমদ বিভাগীয় বণ্টন মামলায় চূড়ান্ত রায় (ডিগ্রি) লাভ করেন, যা তার মালিকানার আইনি ভিত্তিকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে তিনি তার নিজস্ব ভিটা ভূমির একটি অংশ তার স্ত্রী রাজু বেগমের নামে হেবা (দান) করেন- যা ইসলামী শরীয়াহ ও প্রচলিত ভূমি আইনের আলোকে সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বীকৃত হস্তান্তর।
কিন্তু আইনের এই সুস্পষ্ট অবস্থান বাস্তবে পরিণত হয়নি। ২০২৩ সালে, সকল আইনি স্বীকৃতিকে অগ্রাহ্য করে রাজু বেগমকে জোরপূর্বক উক্ত সম্পত্তি থেকে দখলচ্যুত করা হয়। এটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত অন্যায় নয়- এটি ছিল আইনের শাসনের উপর সরাসরি আঘাত।
ন্যায়বিচারের আশায় ভুক্তভোগী পক্ষ “ভূমি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩” এর ধারা ৮ অনুযায়ী চট্টগ্রাম এডিএম কোর্টে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত স্পষ্টভাবে রাজু বেগমের পক্ষে দখল পুনরুদ্ধারের ডিগ্রি প্রদান করেন। এটি ছিল ন্যায়বিচারের একটি প্রত্যাশিত ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিফলন।
কিন্তু- এই ন্যায়বিচারের আলো খুব দ্রুতই ঢেকে যায় এক অদৃশ্য অন্ধকারে।
অভিযোগ উঠেছে, আদালতের এই সুস্পষ্ট ও কার্যকর আদেশকে উপেক্ষা করে প্রতিপক্ষগণ একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন রিভিশন মামলা দায়ের করে- রিভিশন মামলা নং ৪৬/২০২৬, যা দায়ের করা হয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ, ৯ম আদালতে।
আইনের প্রচলিত নীতিমালা ও বিচারিক প্রয়োগ অনুযায়ী, এমন একটি রিভিশন আবেদন সরাসরি খারিজযোগ্য হওয়ার কথা ছিল। কারণ নিম্ন আদালতের আদেশ ছিল সুস্পষ্ট, যুক্তিসংগত এবং আইনের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে- এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে- এই রিভিশন আবেদনটি গ্রহণ করা হয়।
এই গ্রহণযোগ্যতা কোনো সাধারণ বিচারিক ত্রুটি নয়; এটি একটি সুস্পষ্ট নৈতিক বিচ্যুতি, বিচারিক শৃঙ্খলার অবমাননা এবং আইনের শাসনের উপর একটি অশুভ আঘাত।
প্রশ্নগুলো এখন আর চাপা নেই- এগুলো সরাসরি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে- আইনের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন একটি ভিত্তিহীন রিভিশন গ্রহণ করা হলো?
কোন অদৃশ্য শক্তি বা প্রভাব বিচারিক বিবেচনাকে এমনভাবে প্রভাবিত করলো..?
এটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বিচারব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত কোনো অস্বচ্ছ বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ..?
ভুক্তভোগী পক্ষের আশঙ্কা আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দখলদারদের জন্য এক ধরনের “বিচারিক নিরাপত্তা বলয়” তৈরি করছে- যেখানে আদালতের রায়ও আর চূড়ান্ত নয়, বরং প্রভাব, সময়ক্ষেপণ এবং কৌশলের মাধ্যমে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষায়,
“যেখানে নিম্ন আদালত সুস্পষ্টভাবে দখল পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে ভিত্তিহীন রিভিশন গ্রহণ বিচারিক শৃঙ্খলার সরাসরি লঙ্ঘন এবং আইনের শাসনের জন্য এক বিপজ্জনক নজির।”
এই ঘটনা আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা উন্মোচন করে- আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান..?
নাকি প্রভাবশালীদের জন্য আইনের ব্যাখ্যা, প্রয়োগ এবং ফলাফল- সবই ভিন্ন..?
নটরাজ এন. এ পলাশের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ:
“যেখানে আদালতের রায়কেও প্রভাবের জালে আটকে ফেলা যায়, সেখানে ন্যায়বিচার আর একটি নীতিগত বিষয় থাকে না- তা হয়ে যায় দরকষাকষির বস্তু। আর যখন বিচারালয়ই অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে পড়ে।”
শেষ কথা:
চট্টগ্রামের এই ঘটনা কেবল একটি ভূমি বিরোধ নয়- এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার একটি কঠিন পরীক্ষা।
এই পরীক্ষায় ব্যর্থতা মানে শুধু একটি মামলার পরাজয় নয়- এটি হবে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ধারণারই একটা সুফল।















