ঢাকা ০৯:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ :
বিয়ের প্রলোভনে প্রতারণা, ধর্ষণ ও তথ্য গোপন করে বিয়ে: সংবাদ সম্মেলনে নারীর অভিযোগ মানব পাচার ও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগে যশোরের হাসান, তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনে সরকার কাজ করছে — প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সৎ ও জনবান্ধব ইউএনও রাকিবুল হাসানের বদলির আদেশে রানীনগরে হতাশা, আদেশ পুনর্বিবেচনার দাবি মিথ্যা মামলায় ‘ঢাকা প্রতিদিন’-এর সাংবাদিক হাফিজুর রহমান শফিকের মুক্তির দাবিতে তেকসাসের মানববন্ধন ১৬৫ বছরের পুরোনো পুলিশ আইন: কতটা প্রস্তুত ২০২৬ সালের বাস্তবতায়? সংলাপ, সহনশীলতা, সংহতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি বৈশ্বিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’-বিষয়ক ঘোষণা ও কর্মসূচির বাস্তবায়নের অগ্রগতি’ শীর্ষক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত শূন্যপদ পূরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ঝুলে থাকা ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের পদোন্নতি সংক্রান্ত মামলার জটিলতা এখন সমাধানের পথে। এছাড়া বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ( কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে গত দুইদিনে মোট ১৩ জনকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টার (পুশ-ইন) অভিযোগ উঠেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বিরুদ্ধে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা: বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ষোলকলার শিল্প ও জাতিসত্তার জীবন্ত প্রতীক বিশেষ প্রতিবেদন: নটরাজ এন. এ পলাশ।

Foysal Ahmed
  • আপডেট সময় : ১২:৪১:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / ২৭৩ বার দেখা হয়েছে

বাংলা নববর্ষের প্রভাতে উদ্ভাসিত মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক পূর্ণাঙ্গ বহিঃপ্রকাশ। রাজপথ যখন রঙিন মুখোশ, বিশাল ভাস্কর্য, প্রাণবন্ত সংগীত এবং প্রতীকী চিত্রকলায় পরিপূর্ণ হয়, তখন মঙ্গল শোভাযাত্রা যেন এক জীবন্ত মহাকাব্যে রূপ নেয়। প্রতিটি পদক্ষেপে বাজে শুভ শক্তির বিজয়, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের অন্তর্নিহিত আশা ও আকাঙ্ক্ষা। এটি কেবল চাক্ষুষ আনন্দ নয়; বরং এটি বাঙালির চেতনা, বোধ এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতার এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।
তবু, বর্তমান আয়োজনে ষোলকলার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনও অর্জিত হয়নি। বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের প্রাণ—যাত্রাপালা—এখনো শোভাযাত্রার মূল কাঠামোর অংশ নয়। এটি এক শূন্যস্থান, যা কেবল আনন্দের চিত্রকে অর্ধেক করে রাখে; সেই সঙ্গে বাঙালির শিল্প, জাতিসত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঐতিহ্য, গৌরব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
মঙ্গল শোভাযাত্রার শিকড় প্রাচীন বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও চিত্রকলায় নিহিত। প্রাচীন কালের নববর্ষ উদযাপন কেবল আনন্দের সময় ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতিসত্তার এক উদ্ভাসিত রূপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ-এর উদ্যোগে আধুনিক মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এই স্বীকৃতি কেবল গৌরব নয়; এটি আমাদের ওপর একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব আরোপ করে—যে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিল্পকলার পূর্ণাঙ্গ রূপকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে। বর্তমান আয়োজনে ষোলকলার পূর্ণতা না থাকায় এই আন্তর্জাতিক মর্যাদা এক ধরনের অসম্পূর্ণতার মুখোমুখি।
ষোলকলার পূর্ণতা: বাঙালির চেতনার সংহতি
ষোলকলা কেবল শিল্পের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি বাঙালির জীবনধারা, মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা এবং সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়। শোভাযাত্রার প্রতিটি উপাদান—চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, নাট্যকলার অভিনয়, মুখোশ, আলোকসজ্জা এবং স্থানিক বিন্যাস—সার্বিকভাবে দর্শকের মনকে স্পর্শ করে।
তবে পূর্ণাঙ্গ ষোলকলার অভাব এখনো চোখে পড়ে। বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের প্রাণ—যাত্রাপালা—ছাড়া শোভাযাত্রা কেবল দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য এবং চাক্ষুষ সৌন্দর্যের সীমায় আবদ্ধ থাকে।
যাত্রাপালা সংযোজন করলে শোভাযাত্রা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি হয়ে উঠবে সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আন্দোলন। প্রতিটি সংলাপ, গান, নৃত্য পদক্ষেপ এবং প্রতীকী দৃশ্য দর্শকের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। মানুষের অন্তর্নিহিত আশা, আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম এবং সমাজের মূল্যবোধ এই শোভাযাত্রায় এক জীবন্ত রূপ পাবে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
মঙ্গল শোভাযাত্রা সমাজকে একত্রিত করার এক অনন্য মাধ্যম। ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মানুষ একত্রে অংশগ্রহণ করে। এটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতা, শিল্পচেতনা এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে।
যাত্রাপালা সংযোজনের মাধ্যমে শোভাযাত্রা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি বাঙালির মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের জীবন্ত শিক্ষাপ্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। স্থানীয় সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাঙালির শিল্প ও ঐক্যের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।
এটি একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়—যে দেশ তার নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে, সে তার জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতিফলনও সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারবে না।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা ও দায়িত্ব
বর্তমান সময়ে, যখন সমাজে বিভাজন, সহিংসতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়, তখন মঙ্গল শোভাযাত্রা এক আলোকবর্তিকা। তবে এটি শুধুমাত্র আলোকবর্তিকা হতে পারে যদি সরকারের এবং সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষের সচেতন উদ্যোগ থাকে—যাত্রাপালা সংযোজনের মাধ্যমে ষোলকলার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় নিশ্চিত করা।
এটি দেখাবে যে, বাঙালি কৃষ্টি-কালচারের সৌন্দর্য কেবল ঐতিহ্যের স্তরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা ও সৃজনশীলতার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাঙালির মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করবে।
শোভাযাত্রার পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত করা কেবল আনন্দ বা চাক্ষুষ সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি জাতির প্রতি সরকারের দায়িত্ব, যা বাঙালির ইতিহাস, শিল্প ও ঐক্যের সমুন্নত রূপের প্রতিফলন নিশ্চিত করে।
আহ্বান: কবে বাঙালি জাতি পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখবে?
রাজপথে আমরা রঙিন মুখোশ, প্রাণবন্ত সংগীত, বিশাল ভাস্কর্য এবং আলোকিত দৃশ্য দেখি, কিন্তু এই আনন্দ এখনো অসম্পূর্ণ। ষোলকলার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ, বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের প্রাণ—যাত্রাপালা—এখনো অনুপস্থিত।
যাত্রাপালা কেবল নাট্য নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার এক জীবন্ত প্রতিফলন। যখন এটি শোভাযাত্রায় আসবে, তখন আনন্দ কেবল চোখের নয়, হৃদয়েরও হবে।
প্রিয় বাঙালি, আমরা সকলেই চাই পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা, যেখানে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্পকলার উৎকর্ষ এবং জাতিসত্তার গৌরব একত্রে উদ্ভাসিত হবে। এটি শুধুমাত্র আনন্দের জন্য নয়, আমাদের জাতির অহংকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার জন্যও অপরিহার্য।
এখন সময় এসেছে—সচেতনতা, সৃজনশীলতা এবং ঐক্যের মাধ্যমে আমরা দেখাই, আমাদের শোভাযাত্রা কেবল চাক্ষুষ আনন্দ নয়, ষোলকলায় পরিপূর্ণ, যাত্রাপালা সংযোজনসহ একটি সাংস্কৃতিক মহাকাব্য।
প্রিয় সরকার এবং সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষ, জনগণের আশা ও স্বপ্ন স্পষ্ট। বাঙালির ইতিহাস, কৃষ্টি এবং শিল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশের জন্য যাত্রাপালা এখনই সংযোজনের সময়।
বাঙালি জাতি অপেক্ষা করছে—রাজপথে পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখার জন্য।

ট্যাগস:

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মঙ্গল শোভাযাত্রা: বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ষোলকলার শিল্প ও জাতিসত্তার জীবন্ত প্রতীক বিশেষ প্রতিবেদন: নটরাজ এন. এ পলাশ।

আপডেট সময় : ১২:৪১:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

বাংলা নববর্ষের প্রভাতে উদ্ভাসিত মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক পূর্ণাঙ্গ বহিঃপ্রকাশ। রাজপথ যখন রঙিন মুখোশ, বিশাল ভাস্কর্য, প্রাণবন্ত সংগীত এবং প্রতীকী চিত্রকলায় পরিপূর্ণ হয়, তখন মঙ্গল শোভাযাত্রা যেন এক জীবন্ত মহাকাব্যে রূপ নেয়। প্রতিটি পদক্ষেপে বাজে শুভ শক্তির বিজয়, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের অন্তর্নিহিত আশা ও আকাঙ্ক্ষা। এটি কেবল চাক্ষুষ আনন্দ নয়; বরং এটি বাঙালির চেতনা, বোধ এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতার এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।
তবু, বর্তমান আয়োজনে ষোলকলার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনও অর্জিত হয়নি। বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের প্রাণ—যাত্রাপালা—এখনো শোভাযাত্রার মূল কাঠামোর অংশ নয়। এটি এক শূন্যস্থান, যা কেবল আনন্দের চিত্রকে অর্ধেক করে রাখে; সেই সঙ্গে বাঙালির শিল্প, জাতিসত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঐতিহ্য, গৌরব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
মঙ্গল শোভাযাত্রার শিকড় প্রাচীন বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও চিত্রকলায় নিহিত। প্রাচীন কালের নববর্ষ উদযাপন কেবল আনন্দের সময় ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতিসত্তার এক উদ্ভাসিত রূপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ-এর উদ্যোগে আধুনিক মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এই স্বীকৃতি কেবল গৌরব নয়; এটি আমাদের ওপর একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব আরোপ করে—যে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিল্পকলার পূর্ণাঙ্গ রূপকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে। বর্তমান আয়োজনে ষোলকলার পূর্ণতা না থাকায় এই আন্তর্জাতিক মর্যাদা এক ধরনের অসম্পূর্ণতার মুখোমুখি।
ষোলকলার পূর্ণতা: বাঙালির চেতনার সংহতি
ষোলকলা কেবল শিল্পের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি বাঙালির জীবনধারা, মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা এবং সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়। শোভাযাত্রার প্রতিটি উপাদান—চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, নাট্যকলার অভিনয়, মুখোশ, আলোকসজ্জা এবং স্থানিক বিন্যাস—সার্বিকভাবে দর্শকের মনকে স্পর্শ করে।
তবে পূর্ণাঙ্গ ষোলকলার অভাব এখনো চোখে পড়ে। বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের প্রাণ—যাত্রাপালা—ছাড়া শোভাযাত্রা কেবল দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য এবং চাক্ষুষ সৌন্দর্যের সীমায় আবদ্ধ থাকে।
যাত্রাপালা সংযোজন করলে শোভাযাত্রা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি হয়ে উঠবে সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আন্দোলন। প্রতিটি সংলাপ, গান, নৃত্য পদক্ষেপ এবং প্রতীকী দৃশ্য দর্শকের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। মানুষের অন্তর্নিহিত আশা, আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম এবং সমাজের মূল্যবোধ এই শোভাযাত্রায় এক জীবন্ত রূপ পাবে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
মঙ্গল শোভাযাত্রা সমাজকে একত্রিত করার এক অনন্য মাধ্যম। ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মানুষ একত্রে অংশগ্রহণ করে। এটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতা, শিল্পচেতনা এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে।
যাত্রাপালা সংযোজনের মাধ্যমে শোভাযাত্রা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি বাঙালির মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের জীবন্ত শিক্ষাপ্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। স্থানীয় সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাঙালির শিল্প ও ঐক্যের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।
এটি একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়—যে দেশ তার নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে, সে তার জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতিফলনও সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারবে না।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা ও দায়িত্ব
বর্তমান সময়ে, যখন সমাজে বিভাজন, সহিংসতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়, তখন মঙ্গল শোভাযাত্রা এক আলোকবর্তিকা। তবে এটি শুধুমাত্র আলোকবর্তিকা হতে পারে যদি সরকারের এবং সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষের সচেতন উদ্যোগ থাকে—যাত্রাপালা সংযোজনের মাধ্যমে ষোলকলার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় নিশ্চিত করা।
এটি দেখাবে যে, বাঙালি কৃষ্টি-কালচারের সৌন্দর্য কেবল ঐতিহ্যের স্তরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা ও সৃজনশীলতার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাঙালির মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করবে।
শোভাযাত্রার পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত করা কেবল আনন্দ বা চাক্ষুষ সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি জাতির প্রতি সরকারের দায়িত্ব, যা বাঙালির ইতিহাস, শিল্প ও ঐক্যের সমুন্নত রূপের প্রতিফলন নিশ্চিত করে।
আহ্বান: কবে বাঙালি জাতি পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখবে?
রাজপথে আমরা রঙিন মুখোশ, প্রাণবন্ত সংগীত, বিশাল ভাস্কর্য এবং আলোকিত দৃশ্য দেখি, কিন্তু এই আনন্দ এখনো অসম্পূর্ণ। ষোলকলার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ, বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের প্রাণ—যাত্রাপালা—এখনো অনুপস্থিত।
যাত্রাপালা কেবল নাট্য নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, মানবিক মূল্যবোধ, জাতিসত্তা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার এক জীবন্ত প্রতিফলন। যখন এটি শোভাযাত্রায় আসবে, তখন আনন্দ কেবল চোখের নয়, হৃদয়েরও হবে।
প্রিয় বাঙালি, আমরা সকলেই চাই পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা, যেখানে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্পকলার উৎকর্ষ এবং জাতিসত্তার গৌরব একত্রে উদ্ভাসিত হবে। এটি শুধুমাত্র আনন্দের জন্য নয়, আমাদের জাতির অহংকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার জন্যও অপরিহার্য।
এখন সময় এসেছে—সচেতনতা, সৃজনশীলতা এবং ঐক্যের মাধ্যমে আমরা দেখাই, আমাদের শোভাযাত্রা কেবল চাক্ষুষ আনন্দ নয়, ষোলকলায় পরিপূর্ণ, যাত্রাপালা সংযোজনসহ একটি সাংস্কৃতিক মহাকাব্য।
প্রিয় সরকার এবং সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষ, জনগণের আশা ও স্বপ্ন স্পষ্ট। বাঙালির ইতিহাস, কৃষ্টি এবং শিল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশের জন্য যাত্রাপালা এখনই সংযোজনের সময়।
বাঙালি জাতি অপেক্ষা করছে—রাজপথে পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখার জন্য।