১৩ বছরের দীর্ঘশ্বাস, এক ফালি জমির আকুতি ! মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ সদর আলী ফকির
- আপডেট সময় : ১০:৫৪:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
- / ৩৫ বার দেখা হয়েছে
নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
চোখে ঝাপসা দৃষ্টি, শরীরে বার্ধক্যের ভার, আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস—এভাবেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শয্যাশায়ী হয়ে দিন কাটছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ৭৫ বছর বয়সী সদর আলী ফকিরের। তাঁর একমাত্র আকুতি, মৃত্যুর আগে যেন ফিরে পান পৈতৃক ভিটেমাটি। প্রায় ১৩ বছর ধরে আদালতে চলমান একটি ভূমি-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আজ তিনি সর্বস্বান্ত ও অসহায়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রেকর্ড সংশোধনের দাবিতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, নেত্রকোনা এবং বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে মোকদ্দমা নং-১৫৫৫/২০১৪ (ল্যান্ড সার্ভে)-এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট। মামলাটি রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (সংশোধনী-২০০৮)-এর ১৪৫(এ) ধারার বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কেন্দুয়া উপজেলার রঘুনাথপুর মৌজার তফসিলভুক্ত প্রায় ১.৮৭ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে বাদীপক্ষের পিতা-পিতামহ ভোগদখল করে আসছিলেন। মূল মালিক মাযহোম ফকির ১৯৫৭ সালের ২৭ নভেম্বর নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমিটি ক্রয় করেন এবং সেখানে বসবাস ও চাষাবাদ শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে সদর আলী ফকির ও মনফর ফকির সম্পত্তির মালিক হন।
তবে বাদীপক্ষের অভিযোগ, বিবাদীপক্ষের মৃত আবুল হোসেন ফকির বি.আর.এস. জরিপ চলাকালে অসত্য তথ্য দিয়ে মাযহোম ফকিরের কোনো পুত্র সন্তান নেই বলে দাবি করেন এবং ‘সাজিয়া’ নামে এক ভুয়া উত্তরাধিকারী দেখিয়ে বি.আর.এস. খতিয়ান নং-৫৯ প্রস্তুত করান। এর মাধ্যমে এস.এ. খতিয়ান নং-৩৪-এর পৈতৃক সম্পত্তি থেকে অংশ কেটে বিবাদীদের নামে পৃথক খতিয়ান খোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলায় প্রধান বিবাদী হিসেবে রয়েছেন মিলন মিয়া, কাঞ্চন মিয়া, হারুন মিয়া ও কাজল মিয়াসহ রঘুনাথপুর এলাকার আরও কয়েকজন।
জীবনের শেষ প্রান্তে একটাই আকুতি
একসময় ভাঙারি সংগ্রহ ও লোহালক্করের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন সদর আলী ফকির। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী ও মুমূর্ষু। বয়স ও অসুস্থতার ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধের একমাত্র ইচ্ছা—মৃত্যুর আগে নিজের পৈতৃক ভিটেমাটির অধিকার ফিরে পাওয়া এবং সেই ভিটাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে তিনি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তবুও দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর তাঁর আস্থা এখনো অটুট। নানা তথ্য-প্রমাণ তিনি নিজ হাতে খাতায় লিখে সংরক্ষণ করে রেখেছেন, এই আশায় যে একদিন হয়তো ন্যায়বিচার মিলবে।
মামলার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সদর আলী ফকিরের আইনজীবী তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মামলার নথি পর্যালোচনা করে পরে এ বিষয়ে জানানো সম্ভব হবে।
এদিকে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে ভূমি জালিয়াতির মাধ্যমে নিরীহ মানুষের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে আসছে। এ ধরনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সদর আলী ফকিরের মামলাটি দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রকৃত মালিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হোক, যাতে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত তিনি নিজের ভিটেমাটিতে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন।
(বিঃদ্রঃ: প্রতিবেদনে উল্লিখিত ভূমি জালিয়াতির অভিযোগগুলো মামলার নথি ও বাদীপক্ষের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিবাদীপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।)






















